একটা সম্পর্ক

আমাদের জীবনটাকে যদি দাবার মতন করে ভাবি সেখানে ৬৪টা ঘর হতে পারে আমাদের জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়। প্রতিটি ঘরে থাকা ঘুটিগুলো হতে পারে একেকটা সম্পর্ক । 

আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলো যেমন অভিভাবকসূত্রে সম্পর্কের কেউ, বৈবাহিকসূত্রে সম্পর্কের কেউ, ভালো বন্ধু। এরা হতে পারে দাবার দামী ঘুটির মতন কেউবা রাণী কিংবা মন্ত্রীর ভূমিকায়, কেউবা নৌকার ভূমিকায়, কেউবা হাতি কিংবা ঘোড়া। শেষ পর্যন্ত যে লড়াই করে যায় সে হচ্ছি আমরা যার নাম রাজা দাবার শেষ ঘুটি। যে শেষ মানে জীবনের সমাপ্তি। কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে যারা খুব কম সময়ের জন্যে জীবনে আসে আবার দ্রুত জীবন থেকে চলে যায়। আবার কেউ কেউ অপ্রত্যাশিতভাবে শেষ পর্যন্ত আমাদের হয়ে লড়ে যায় সে হচ্ছে দাবার সবচেয়ে দূর্বল ঘুটি বড়ে কিংবা সৈন্য। এই বড়ের ক্ষমতা সত্যিই বড়ই সীমিত কিন্তু একটা সময় তারা লড়তে লড়তে প্রিয় মানুষ হয়ে যায়। এরকম সম্পর্ক খুবই বিরল।

আমাদের জীবনে এমন অনেক সম্পর্কের মানুষ আসে যায়। কেউবা থেকে যায় কেউবা চলে যায়। তবুও আমাদের জীবন কারোর জন্যে থেমে থাকে না। 

আমি মূলত যে কোন সম্পর্ক স্থাপনে খুব বেশী মাত্রায় রক্ষণশীল কেননা, প্রতিটি সম্পর্ক আমার কাছে খুব মূল্যবান হুট করে কাউকে ভুলে যাওয়ার মতন সম্পর্ক আমার নীতিতে পড়ে না। তাই হুট করে কেউ আমার বন্ধু হতে পারে না। আমি যখন কাউকে বন্ধু কিংবা আপন ভাবার মতন মনে করি তখন তাকে কাছে টেনে নেই। আমি বিশ্বাস করি, আমার জীবনে এমন একটা সময় ছিল, সময় যাচ্ছে, সময় আসবে কোন এক সময় সেই বন্ধুটা কিংবা আপন কেউ হঠাৎ পানিতে আমার ডুবে যাওয়া হাতটা ধরে টেনে বাঁচিয়ে তুলেছিল, তুলছে কিংবা তুলবে আমাকে। 

একটা সম্পর্ক জীবনের মানে শেখায় তাই একটা সম্পর্ক কখনোই ছেলেখেলা নয়।

Advertisements

মি.মি ও ইঞ্চি

সেই ছোটবেলাতে পার্টিগণিত, বীজগণিত করার সময় একগাদা সূত্র মুখস্থ করেছিলাম সেইগুলো ঠোটস্থ ছিল সব কিছু অনায়াসে বলে দিতে পারতাম কত মিটারের কত ফিট, কত পাউন্ডে কত কেজি, আরো অনেক কিছু। আজকাল বলতে পারি না। সব ভুলে বসে আছি। আজ ক্যামেরার অনেক কিছু বুঝতে গেলে হিমশিম খাই খুব সহজ প্রশ্ন কত মিলিমিটারে কত ইঞ্চি। আমার কাছে ইঞ্চির হিসাব খুব সহজ লাগে। বাবার কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক শিক্ষাগুলোর অন্যতম আঙ্গুল দিয়ে ইঞ্চি মেপে ফেলা, হাত দিয়ে ফিট মেপে ফেলা, পায়ের স্টেপ ফেলে মিটার মেপে ফেলা। অনুমান ভিত্তিক দিক দিয়ে আমরা বাঙ্গালী অনেক দ্রুত হিসাব করে ফেলি। যাক আসল কথা ফিরি আবার, প্রশ্ন টা ছিল আমি যে ক্যামেরাটা ব্যবহার করি সেটি ৬০ ডি ক্যামেরা যার সেন্সর ২২.৩ * ১৪.৯ মি.মি। আমার হঠাৎ মাথায় আসল ২২.৩ মি.মি কিংবা ১৪.৯ মি.মি মানে কত ছোট। সূত্র মনে নাই তাই ইন্টারনেটে সূত্র খুঁজলাম বের করে ফেললাম ২২.৩ মি.মি মানে হলো ০.৮৮ ইঞ্চি অর্থাৎ বুড়া আঙ্গুলের অর্ধেকের একটু কম । আমার বুড়া আঙ্গুলটা ২ ইঞ্চি। হে: হে:। এইভাবে আপনি সহজে বুঝে ফেলতে পারবেন । যেই ওয়েব থেকে আমি এ ধরনের ক্যালকুলেশান করি সেটির ঠিকানা এখানে http://www.metric-conversions.org/length/millimeters-to-inches.htm । ধন্যবাদ।

(বি:দ্র: দয়া করে কেউ আমাকে গণিত বিষয়ক প্রশ্ন করবেনে না। আমি গণিতে অনেক কষ্টে পাস করেছিলাম। আমি এ ব্যাপারে খুবই দুর্বল।)

তুমুল ব্যস্ততার জন্যে এইটা ওইটা ভুলে যাওয়া নতুন কিছু ছিল না। দুশ্চিন্তা সুচিন্তা সব কিছু আমাদেরকে ব্যতিব্যস্ত রাখে। আমাদের যখন ক্লান্তি পায় আমরা ঘুমিয়ে যাই তখন আমরা ভুলে যাই অনেক কিছু, হয়ত আজ প্রিয় কারোর জন্মদিন ছিল আমাদের মনে থাকে না। হয়ত কারোর হোমওয়ার্ক করার কথা ছিল ভুলে গিয়েছে প্রায়ই স্কুলে গিয়ে টিচারের কাছে বকা খাচ্ছে। আমি ভুলে যেতাম অনেক কিছু। 

আমি প্রায়ই পড়া ভুলে যেতাম কারণ মুখস্থ বিদ্যা আমার কোন কালেই ছিল না। মা আমাকে রোজ রোজ পড়াতেন আর লেখাতেন, যার জন্যে আজ হাতের লেখা দেখে কেউ ভালো বললে মা’র দিকে তাক করে বলি, “আমার মা আমার হাতের লেখা”। আমি যাতে বীজগণিতের সূত্রগুলো না ভুলে যাই তাই মা আমাকে সাদা কাগজে কয়েকবার লেখাতেন পরে সেটি আমার পড়ার টেবিলের সামনে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই স্টিকির অভ্যাসটা জাপ্টে ধরে বেড়ে উঠে। আমার পড়ার টেবিলে একসময় কাগজ কলম স্কেলের পাশে জায়গা করে নেয় হলুদ বর্ণ চারকোণা কাগজ। বিল্ট ইন আঠা স্মার্ট কাগজ আঠা লাগানোর আর দরকার হলো না। আমার অফিসের ডেস্কে এমন কাগজে কাজ করে যাই। আজকাল কোন কাজ ভুলে যেতে পারি না। এই হলুদ কাগজ গুলো আমার করণীয় কাজগুলো মনে করিয়ে দেয়। 

আজকাল অফলাইন টুকাটুকি বাইরে অনলাইন টুকাটুকি চলে এইটা ওইটা আমি এভার নোটে লিখে রাখি। যা আমি সব সময় দেখতে পাই যেখানে থাকি। আমি একজায়গাতে লিখে রাখি সেটি সব জায়গাতে কপি হয়ে যাচ্ছে। তাই আজ আমার কাজ ভুলে যাওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। 

https://www.evernote.com/

ছোট ছোট সঞ্চয়

“ বিন্দু বিন্দু মিলে হয় মহাসিন্ধু ”, এই কথাটা একদম কিন্তু ফেলে দেওয়া যায় না। 

একটা উদাহরন দিয়ে বলি, আমার সঞ্চয় করার অভ্যাস প্রথম মা আমাকে শিখিয়ে দেন। ১৯৮০ সালের কথা মা তথন ঢাকা ভাসির্টি পড়তেন কার্জন হল থেকে ফেরার সময় শিশু একাডেমীর গেইট থেকে গাছের চারা কিনতেন, মাটির জিনিষ কিনতেন। মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে প্রায়ই শিশু একাডেমী, বইমেলায় নিয়ে যেতেন। মা আমাকে নিয়ে প্রতিদিন বিকালে আমাদের দোতালার বাড়ীর বিশালছাদে চারা গাছ বুনতেন। পানি দিতেন। যখন ফুল ধরত দারুন আনন্দ হত। আবেগে চোখে পানি চলে আসত। তারপর মা শেখালেন কি করে নিজের অল্প আয় থেকে সঞ্চয় করতে হয়। তখন চার কি পাঁচ বছর বয়স হবে। সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করে নার্সারীতে পড়তাম। মা শিশু একাডেমীর আঙ্গিনা থেকে মাটির ব্যাংক কিনে আনলেন। আমাকে বললেন, তোর নিজের মতন যা কিছু কিনতে ইচ্ছে করবে তখন তুই সে জিনিষটা কেনার জন্যে যখন হাতে পয়সা পাবি কিংবা যে পয়সা জমা থেকে যাবে সেটি এখানে জমাবি। আমার কথাটা মনে ধরে গেল, কিন্তু ঝামেলা বাঁধল কি কিনব। কি কিনব ও টুকুন বয়সে ঠিক করতে পারি নি। আমার কি দরকার সেটা বোঝার মতন ক্ষমতা ছিল না তাই কত টাকা জমাবো সেই পরিকল্পনা না করে ২৫ পয়সা আর ৫০ পয়সা করে জমানো শুরু করে দিলাম। এই হল, সঞ্চয় অভ্যাস হওয়ার ছোটবেলার গল্প। 

তারপর একসময় টাকা জমানোটা নেশায় পরিণত হল। প্রতি মাসে বাজেট ঠিক করতাম। আগামী মাসের কি কিনব সেটি আগের মাসে পরিকল্পনা করে ফেলতাম। আমার টাকার উৎস ছিল বাবার কাছে থেকে পাওয়া টিফিন খরচ, যাতায়াত খরচ আর নিজের কিছু কম্পিউটারের কাজ করে আয় । আমার বাজেট পরিকল্পনাটা ছিল খুব মজার ধর আমি একটা জিনিষ পছন্দ করেছি সেটির দাম ১,৫০০ টাকা তারমানে আমাকে ১,৫০০ টাকা সঞ্চয় করতে হবে। সঞ্চয় কিভাবে হবে প্রতিদিন যা আয় করি সেটি থেকে খরচ বাদ দিয়ে একটা অবশিষ্ট অংশ জমা রেখে এই ১,৫০০ টাকা সঞ্চয় করতে হবে। তারমানে প্রতিদিন হিসেবে ৫০ টাকা (১৫০০টাকা/৩০দিন) আমাকে বাঁচাতে হবে। যদি বেশী খরচ হয়ে যায় সেই ক্ষেত্রে অন্য কোন দিন হাড় কিপটামী করে হলে জমাতে হবে। একসময় আমি আমার টার্গেট পূরণ করে ফেলতাম। একসময় সেটি কিনে বাবাকে দেখাতাম বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরতেন। বাবার কাছ থেকে প্রথম জানলাম একে বলে আত্মনির্ভরশীলতা। যা খুবই সম্মানের। 

যারা মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ তাদের পক্ষে যে কোন স্বপ্ন পূরণ করা কঠিন কিছু ছিল না আবার সহজ কিছু নয়। যেমন ধরো, ডিএসএল আর ক্যামেরা বিলাসবহুল পণ্য কারোর জন্যে আবার কারো জন্যে নয়। তবে কিন্তু কঠিন কিছু নয়। একটা ডিএসএলআর কিনতে যদি ৩৬,০০০ টাকা লাগে তাহলে সেটি প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা কিংবা প্রতিদিন ১০০ টাকা জমিয়ে দুই বছরে কিনে ফেলা যায় কিংবা ৩,০০০ টাকা কিংবা ২০০ টাকা প্রতিদিন জমিয়ে একবছরে কিনে ফেলা যায়। এভাবে যে কোন জিনিষ কিনে ফেলা সম্ভব। একবছর দেখতে দেখতে চলে যায় যখন নিজের মতন করে নিজের জমানো টাকাতে কোন কিছু কিনবেন তখন বুঝতে পারবেন আপনি বিরাট কিছু অর্জন করে ফেলেছেন।

একাল ও সেকাল (পর্ব-১)

অ আ লেখালেখি আরেকটি প্রজেক্ট শুরু হল। আমরা সবাই একটা সময়ের সাক্ষী । আমাদের বড় হয়ে যাওয়ার পিছনে অনেকগুলো গল্প থাকে। যেগুলো আজকের বড় হতে থাকা ছেলে মেয়ের কাছে অবাস্তব ও অলৌকিক মনে হতে পারে। তবু অনেক কিছু শেখার থাকে। জানার থাকে। সেসব কথাগুলো আমাদের সবার কাছে পৌছে দেওয়াটা খুব জরুরী। নতুন প্রজম্ম যাতে ভুল পথে চলে না যায় সে দিক নজর রাখা আমাদের দায়িত্ব।

একাল ও সেকাল  (পর্ব-১)
———————
প্রথমবার স্কুল পালালাম। আমার মত ছাপোষা ও ভীরু ছেলের মতন স্কুল পালানোটা রীতিমতন ভয়ঙ্কর কিছু। বাবা রোজ অফিস যাওয়ার পথে আমাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যান। আজ ক্লাসে ঢুকে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলাম। শরীর যে খারাপ ছিল তাও না। আমার একটা নতুন বন্ধু হয়েছে ওর নাম নয়ন। আমাদের দু’জনের নামের সাথে মিল থাকায় সাতদিনের মাথায় গাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। নয়নের কথা মতন স্কুল থেকে প্রথমবার পালালাম। নয়ন থাকত স্কুলের কাছের কলোনীতে। তাই পালিয়ে গিয়ে ওর বাসায় গেলাম। ওদের বাসাটা কেমন যেন অগোছানো। বেশীক্ষন থাকি নি। বেরিয়ে বাড়ী চলে আসলাম। মা আমাকে দেখে বকা দিলেন। পরে আদর করলেন, ছেলের বোধহয় শরীর ভালো না।

পরের দিন আমাকে ক্লাস শিক্ষক ডেকে বললেন, কাল স্খুলে আসো নি কেন? আমি দুরুদুরু কম্পনে বললাম, ”শরীর খারাপ করেছিল”। স্যার বললেন, কাল বাবার কাছ থেকে সাইন নিয়ে অনুপস্থিতির দরখাস্ত নিয়ে আসবে। জীবনের প্রথম মিথ্যা কথা বলা শুরু। নয়ন আমার পিছনে বসে মুচকি হাসছিল। আমার ভিতর অপরাধবোধ হচ্ছিল। তখন ঠিক করলাম আর পালাবো না। অতঃপর মাসখানিক পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। একগাদা হোমওয়ার্ক। সামনে রোজা চল্লিশ দিনের একটা বড় বন্ধ আছে তাই অনেক পড়ার চাপ। স্কুল খুলে পরীক্ষা। স্কুল ছুটি শেষে আজকাল মা আসতে পারে তাই রোজ আমার প্রিয় কিছু সহপাঠিদের নিয়ে রেললাইন দিয়ে হাটতে হাটতে বাড়ী ফিরি।

আজ স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। স্কুল ছুটির পর নয়ন বললো, আজ আমাদের বাড়ীতে তোর দাওয়াত। আমি অবাক হলাম, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ দাওয়াত। না করতে পারলাম না। একটু খারাপ লাগলো এই ভেবে মা রোজ আমার জন্যে খাবার বানিয়ে রাখে আমি বাড়ী ফিরে সেগুলো গোগ্রাসে গিলতে থাকি প্রতিদিন। নয়নদের বাড়ীতে ফোন ছিল না। আজ খাব না, এই কথাটা মাকে জানানো গেল না। মা আমার জন্যে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করবে। ভয় ঢুকে গেল। আমি আজ শেষবারের মতন নয়নের বাসায় গেলাম গিয়ে দেখি একদল ছেলে বসে সিগারেট খাচ্ছে। পাশে ছড়ানো ছিটানো বিরিয়ানীর প্যাকেট, কাঁচের বোতল ভর্তি কোক। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা ছেলে নেতিয়ে পড়ে আছে। পাশে সিরিঞ্জ পড়ে আছে। নয়ন আমাকে রেখে পাশের ঘরে গিযেছিল। আমি তখন বুঝতে পারলাম আমি ফেঁসে গেছি নেশাখোরদের ঘরে। ওদের বাড়ীটা এক তলা, আরো কয়জন আসবে বলে মূল দরজার ছিটকানী খোলা ছিল। আমি বাথরুমের কথা বলে পালিয়ে গেলাম। সেদিন যেভাবে স্কুল পালিয়েছিলাম। সেই পালানোর সুবাদে আজকে আমি শিক্ষিত মানুষ হতে পেরেছি। আমার মতন অনেকে আছেন যারা কখন পালাতে পারেন না, চান না তখন তাদের জীবন থেকে ছুটি নিতে হয়। তাদের পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।

আজ যারা বাবা-মা, অভিভাবক তাদেরকে আমি অনুরোধ করব, আপনার ছেলেমেয়ে কাদের সাথে মিশছে তাদের সম্পর্কে খবর রাখুন। তাদের বাড়ীতে যান। তাদেরকে অভিভাবকসহ বাড়ীতে দাওয়াত করুন। নিয়মিত স্কুল শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখুন। ছেলে মেয়েদের সাথে সব কিছু শেয়ার করুন। ওদেরকে কথায় কথায় বকতে যাবেন না। বন্ধু হয়ে যান। দেখবেন ওরা আপনাকে গর্বিত করবে দারুন কিছু করে।

অয়ন আহমেদ
২২ই আগষ্ট, ২০১৩

ayonahmed@gmail.com

মেঘরা চারিদিকে আলো ছড়ায় আর ঐশীরা অন্ধকারে ঢেকে যায়

প্রচলিত কৌতুক আছে, বাঘে ছুলে ষোল ঘা, পুলিশে ছুলে আঠারো ঘা। যার অর্থ দাঁড়ায় বাঘের থেকে পুলিশ অনেক বেশী ক্ষমতার অধিকারী । আইনের চোখে দ্রুত গতিতে কার্যকর পেশা হচ্ছে পুলিশের । পুলিশের বিরুদ্ধে কেউ অপরাধ করলে পুলিশ তখন আইনের ধার ধরে না, আদালতের নির্দেশের অপেক্ষাতে থাকে না। এরা দ্রুত ট্রাইবুনালের আদালতের থেকে দ্রুত গতিতে কাজ করে।

নিহত সাগর ও রুনি পেশাগতভাবে সাংবাদিক ছিলেন । তাদেরকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে এখনও বের করা সম্ভব হয় নি, কারা হত্যাকারী। কিংবা সম্ভাব্য হত্যাকারীর টিকিটুকু ধরা যায় নি। তারা যে হত্যা হয়েছে সেটা নিয়েও মেঘ ও মেঘের মামাকে বারবার আদলতের কাছে ধরনা দিতে হচ্ছে। মেঘের র্দুভাগ্য একটাই মেঘের বাবা মা পুলিশে চাকরী করতেন না । যদি করতেন তাহলে অপরাধীদের ধরতে একদিনের বেশী সময় লাগত না। মেঘকে দাঁড়াতে হত না প্রেস ক্লাবে নিজের বাবা মার হত্যার বিচারের দাবীতে।

গত বুধবার চামেলীবাগে নিমর্ম হত্যার শিকার হয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। বুধবার বিকালে তাদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং রাতে তাদের হত্যা করা হয়। বৃহস্পতিবার চলে গেলেও কাক পক্ষী টের পায় নি। মাহফুজুর রহমানের ভাই ঘটনাটি পুলিশকে অবহিত করেন এবং শুক্রবার পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ ও মিডিয়া ঢালাও ভাবে সংবাদ প্রচার করে এবং তৎপর কার্যক্রম দেখায়। যার ফলে অসম্ভব দ্রুততায় শুক্রবারের ভিতর প্রায় সকল আসামীদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জানা গেল, নিজের মেয়ে ঐশী তাদেরকে হত্যা করে, কারন তাকে স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করতে না দেওয়া হয় নি। আমার কাছে বোধগম্য হচ্ছে না, নিজের বাবামাকে হত্যা করার মত মানসিকতা গড়ে তোলার সুযোগ পেল কি করে। পুলিশ ও মিডিয়া ঢালাওভাবে ঐশীকে উপস্থাপন করছে খারাপ মেয়ে, বাজে মেয়ে, বখে যাওয়া মেয়ে এই বিশেষণ যোগ করে। যেহেতু ঐশী মেয়ে এবং পুলিশ হত্যাকারী তাই তাকে প্রতিটি নিউজপেপারের কভার স্টোরী বানানো হচ্ছে। এখন প্রশ্ন কেন এরকম হবে, কেন হত্যা হবে, কেন একটা মেয়ে নষ্ট হয়ে যাবে? এখানে দায় কার বাবা মার নাকি সমাজ ব্যবস্থার। আজকের হতভম্ব ঐশী জানে না, বুঝবে না সামনের ভবিষ্যতের রাস্তাগুলো গভীর অন্ধকারে ঢেকে গেছে। সে খুনীকে সহায়তা করেছে তাই সে খুনী তার বিচার হতেই হবে।

অতৎপর ভবিষ্যতে আর কেউ যে এভাবে হত্যা হবে না এই গ্যারান্টি কি সমাজ, পুলিশ, আদালত, মিডিয়া কেউ কি আমাদের দিতে পারবে? যদি না দিতে পারে তাহলে দায় কার? আদালত, পুলিশ, মিডিয়া কেউ কি বখে যাওয়া এইসব ছেলে মেয়েদের কথা আদৌ কিছু ভাবছে? এদের বাবা ও মার দায় বদ্ধতা সমাজের কাছে কতটুকু? এই রকম অনেক প্রশ্ন আসবে কিন্তু উত্তর আসবে না।

শিক্ষিত সভ্য জাতি একটি দেশের মেরুদন্ড

আজকালকার যুগে প্রতিটি গুরুজনদের কাছে একটা ব্রত হচ্ছে, নিজের সন্তানদেরকে শিক্ষাদীক্ষায় মানুষ করা। সত্যিকার অর্থে মানুষ বলে গণ্য করা হবে তখনই যখন সেই সন্তান শিক্ষাদীক্ষা শেষ করে চাকরী বাকরি করে পরিবারের উপাজর্নক্ষম ব্যাক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে । তাই গুরুজনদের দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজ সন্তানের নিজের পায়ে দাঁড়ানোকে মানুষ হয়েছে বলে মনে করা হয়।

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমরা বেড়ে উঠেছিলাম একটা যৌথ পরিবারের ছায়াতলে থেকে আমাদেরকে বলা হয়েছিল, আলোকিত মানুষ হতে। প্রথমে আমাদের পারিবারিক মহলে বড় চাচা, মা, ফুপুর কাছে শিক্ষাগ্রহন পর্ব শুরু হয়েছিল তারপর ছোটবেলাতেই কোরআন শিক্ষা ধর্মকে জানার তাগিদে। জুনিয়র স্কুল পর্ব চলার সাথে কোরআনের অক্ষরগুলোও চির চেনা হয়ে উঠে। দাদা মারা যাবার সময় তাঁর প্রিয় নোকতাবিহীন কোরআন শরীফ মা’র কাছে হেফাজত করে যান। সেখানে বাংলা অর্থ সম্বলিত কোরআন শরীফ। আমি ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখেছিলাম দাদুর মতন নোকতাবিহীন কোরআন সূর করে পড়ব। এক সময় আয়ত্বে চলে আসে আমার এই আয়ত্বে আনার পেছনে বড় অবদান ছিল আমার ছোট বেলাকার আমপাড়ার হাতেখড়ি তরুন হুজুর হাবিবুর রহমান সাহেবের। উনি আমাকে পরিপূর্ণ ইসলামের আলোতে বড় করেছিলেন। উনি আমাকে কোনদিন কার্টুন দেখতে বারণ করেন নি। উনি কোনদিন বলেন নি, ছবি কিংবা সিনেমা দেখা হারাম। উনি আমাকে একটা কথা আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারোর কাছে মাথা নত করবে না কিংবা অন্য কাউকে তোমার প্রভু মানবে না।

অতঃপর আমাদেরকে শেখানো হয়েছিল বড়দেরকে সম্মান করতে এবং ছোটদেরকে সম্মান করতে। ধর্ম, গোত্র, পদ, স্থান যাই হোক না কেন, এই নিয়ম বাধ্যতামূলক ছিল। তাই আমাদের বাড়ী এসে করিম চাচা কলা দিতে এসে চা খেয়ে যেতেন। পাড়ার দোকানদার খুরশীদ ভাই মা’র ফরমায়েশ মোতাবেক জিনিষ দিয়ে যেতেন। মা উনাকে নাস্তার ব্যবস্থা করে দিতেন। আমাদের বাড়ীর কেয়ারটেকার ইদরীস চাচাকে আমরা ঈদের দিন পা ধরে সালাম করতাম। ইদরীস চাচা আমাদেরকে ভাতিজার মতন আদর করতেন। আমরা তাই রিকসাওয়লাকে ভাই যাবেন বলে ডাকি, আপনি বলে সম্বোধন করি। বাড়ীতে আজও বুয়াকে খালা বলে ডাকি। এগুলো আমাদের পারিবারিক মৌলিক শিক্ষা। ব্যবহারে বংশের পরিচয় এই আমাদের দ্বিতীয় শিক্ষা।

আমরা যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা অর্জন করি, ভালো চাকরি বাকরি করি। আমরা কিন্তু তখনো পরিপূর্ণ সভ্য মানুষ হয়ে উঠবো না যতক্ষন না আমরা আচরন, ব্যবহার, কথা বার্তাতে সুশৃঙ্খল হতে পারব। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন করে তোলে কিন্তু আলোকিত মানুষ হতে হলে শিক্ষার পাশাপাশি হৃদয়কে পরিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন করে তোলাটা বেশী জরুরী।

শুধু অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষাই শুধু মৌলিক নয়, ভালো মনের মানুষ হওয়াও অন্যতম মৌলিক শিক্ষা যা আমাদের সমাজকে সব সময় আলোকিত করে রাখবে।