একটা সম্পর্ক

আমাদের জীবনটাকে যদি দাবার মতন করে ভাবি সেখানে ৬৪টা ঘর হতে পারে আমাদের জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়। প্রতিটি ঘরে থাকা ঘুটিগুলো হতে পারে একেকটা সম্পর্ক । 

আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলো যেমন অভিভাবকসূত্রে সম্পর্কের কেউ, বৈবাহিকসূত্রে সম্পর্কের কেউ, ভালো বন্ধু। এরা হতে পারে দাবার দামী ঘুটির মতন কেউবা রাণী কিংবা মন্ত্রীর ভূমিকায়, কেউবা নৌকার ভূমিকায়, কেউবা হাতি কিংবা ঘোড়া। শেষ পর্যন্ত যে লড়াই করে যায় সে হচ্ছি আমরা যার নাম রাজা দাবার শেষ ঘুটি। যে শেষ মানে জীবনের সমাপ্তি। কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে যারা খুব কম সময়ের জন্যে জীবনে আসে আবার দ্রুত জীবন থেকে চলে যায়। আবার কেউ কেউ অপ্রত্যাশিতভাবে শেষ পর্যন্ত আমাদের হয়ে লড়ে যায় সে হচ্ছে দাবার সবচেয়ে দূর্বল ঘুটি বড়ে কিংবা সৈন্য। এই বড়ের ক্ষমতা সত্যিই বড়ই সীমিত কিন্তু একটা সময় তারা লড়তে লড়তে প্রিয় মানুষ হয়ে যায়। এরকম সম্পর্ক খুবই বিরল।

আমাদের জীবনে এমন অনেক সম্পর্কের মানুষ আসে যায়। কেউবা থেকে যায় কেউবা চলে যায়। তবুও আমাদের জীবন কারোর জন্যে থেমে থাকে না। 

আমি মূলত যে কোন সম্পর্ক স্থাপনে খুব বেশী মাত্রায় রক্ষণশীল কেননা, প্রতিটি সম্পর্ক আমার কাছে খুব মূল্যবান হুট করে কাউকে ভুলে যাওয়ার মতন সম্পর্ক আমার নীতিতে পড়ে না। তাই হুট করে কেউ আমার বন্ধু হতে পারে না। আমি যখন কাউকে বন্ধু কিংবা আপন ভাবার মতন মনে করি তখন তাকে কাছে টেনে নেই। আমি বিশ্বাস করি, আমার জীবনে এমন একটা সময় ছিল, সময় যাচ্ছে, সময় আসবে কোন এক সময় সেই বন্ধুটা কিংবা আপন কেউ হঠাৎ পানিতে আমার ডুবে যাওয়া হাতটা ধরে টেনে বাঁচিয়ে তুলেছিল, তুলছে কিংবা তুলবে আমাকে। 

একটা সম্পর্ক জীবনের মানে শেখায় তাই একটা সম্পর্ক কখনোই ছেলেখেলা নয়।

মি.মি ও ইঞ্চি

সেই ছোটবেলাতে পার্টিগণিত, বীজগণিত করার সময় একগাদা সূত্র মুখস্থ করেছিলাম সেইগুলো ঠোটস্থ ছিল সব কিছু অনায়াসে বলে দিতে পারতাম কত মিটারের কত ফিট, কত পাউন্ডে কত কেজি, আরো অনেক কিছু। আজকাল বলতে পারি না। সব ভুলে বসে আছি। আজ ক্যামেরার অনেক কিছু বুঝতে গেলে হিমশিম খাই খুব সহজ প্রশ্ন কত মিলিমিটারে কত ইঞ্চি। আমার কাছে ইঞ্চির হিসাব খুব সহজ লাগে। বাবার কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক শিক্ষাগুলোর অন্যতম আঙ্গুল দিয়ে ইঞ্চি মেপে ফেলা, হাত দিয়ে ফিট মেপে ফেলা, পায়ের স্টেপ ফেলে মিটার মেপে ফেলা। অনুমান ভিত্তিক দিক দিয়ে আমরা বাঙ্গালী অনেক দ্রুত হিসাব করে ফেলি। যাক আসল কথা ফিরি আবার, প্রশ্ন টা ছিল আমি যে ক্যামেরাটা ব্যবহার করি সেটি ৬০ ডি ক্যামেরা যার সেন্সর ২২.৩ * ১৪.৯ মি.মি। আমার হঠাৎ মাথায় আসল ২২.৩ মি.মি কিংবা ১৪.৯ মি.মি মানে কত ছোট। সূত্র মনে নাই তাই ইন্টারনেটে সূত্র খুঁজলাম বের করে ফেললাম ২২.৩ মি.মি মানে হলো ০.৮৮ ইঞ্চি অর্থাৎ বুড়া আঙ্গুলের অর্ধেকের একটু কম । আমার বুড়া আঙ্গুলটা ২ ইঞ্চি। হে: হে:। এইভাবে আপনি সহজে বুঝে ফেলতে পারবেন । যেই ওয়েব থেকে আমি এ ধরনের ক্যালকুলেশান করি সেটির ঠিকানা এখানে http://www.metric-conversions.org/length/millimeters-to-inches.htm । ধন্যবাদ।

(বি:দ্র: দয়া করে কেউ আমাকে গণিত বিষয়ক প্রশ্ন করবেনে না। আমি গণিতে অনেক কষ্টে পাস করেছিলাম। আমি এ ব্যাপারে খুবই দুর্বল।)

তুমুল ব্যস্ততার জন্যে এইটা ওইটা ভুলে যাওয়া নতুন কিছু ছিল না। দুশ্চিন্তা সুচিন্তা সব কিছু আমাদেরকে ব্যতিব্যস্ত রাখে। আমাদের যখন ক্লান্তি পায় আমরা ঘুমিয়ে যাই তখন আমরা ভুলে যাই অনেক কিছু, হয়ত আজ প্রিয় কারোর জন্মদিন ছিল আমাদের মনে থাকে না। হয়ত কারোর হোমওয়ার্ক করার কথা ছিল ভুলে গিয়েছে প্রায়ই স্কুলে গিয়ে টিচারের কাছে বকা খাচ্ছে। আমি ভুলে যেতাম অনেক কিছু। 

আমি প্রায়ই পড়া ভুলে যেতাম কারণ মুখস্থ বিদ্যা আমার কোন কালেই ছিল না। মা আমাকে রোজ রোজ পড়াতেন আর লেখাতেন, যার জন্যে আজ হাতের লেখা দেখে কেউ ভালো বললে মা’র দিকে তাক করে বলি, “আমার মা আমার হাতের লেখা”। আমি যাতে বীজগণিতের সূত্রগুলো না ভুলে যাই তাই মা আমাকে সাদা কাগজে কয়েকবার লেখাতেন পরে সেটি আমার পড়ার টেবিলের সামনে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই স্টিকির অভ্যাসটা জাপ্টে ধরে বেড়ে উঠে। আমার পড়ার টেবিলে একসময় কাগজ কলম স্কেলের পাশে জায়গা করে নেয় হলুদ বর্ণ চারকোণা কাগজ। বিল্ট ইন আঠা স্মার্ট কাগজ আঠা লাগানোর আর দরকার হলো না। আমার অফিসের ডেস্কে এমন কাগজে কাজ করে যাই। আজকাল কোন কাজ ভুলে যেতে পারি না। এই হলুদ কাগজ গুলো আমার করণীয় কাজগুলো মনে করিয়ে দেয়। 

আজকাল অফলাইন টুকাটুকি বাইরে অনলাইন টুকাটুকি চলে এইটা ওইটা আমি এভার নোটে লিখে রাখি। যা আমি সব সময় দেখতে পাই যেখানে থাকি। আমি একজায়গাতে লিখে রাখি সেটি সব জায়গাতে কপি হয়ে যাচ্ছে। তাই আজ আমার কাজ ভুলে যাওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। 

https://www.evernote.com/

ছোট ছোট সঞ্চয়

“ বিন্দু বিন্দু মিলে হয় মহাসিন্ধু ”, এই কথাটা একদম কিন্তু ফেলে দেওয়া যায় না। 

একটা উদাহরন দিয়ে বলি, আমার সঞ্চয় করার অভ্যাস প্রথম মা আমাকে শিখিয়ে দেন। ১৯৮০ সালের কথা মা তথন ঢাকা ভাসির্টি পড়তেন কার্জন হল থেকে ফেরার সময় শিশু একাডেমীর গেইট থেকে গাছের চারা কিনতেন, মাটির জিনিষ কিনতেন। মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে প্রায়ই শিশু একাডেমী, বইমেলায় নিয়ে যেতেন। মা আমাকে নিয়ে প্রতিদিন বিকালে আমাদের দোতালার বাড়ীর বিশালছাদে চারা গাছ বুনতেন। পানি দিতেন। যখন ফুল ধরত দারুন আনন্দ হত। আবেগে চোখে পানি চলে আসত। তারপর মা শেখালেন কি করে নিজের অল্প আয় থেকে সঞ্চয় করতে হয়। তখন চার কি পাঁচ বছর বয়স হবে। সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করে নার্সারীতে পড়তাম। মা শিশু একাডেমীর আঙ্গিনা থেকে মাটির ব্যাংক কিনে আনলেন। আমাকে বললেন, তোর নিজের মতন যা কিছু কিনতে ইচ্ছে করবে তখন তুই সে জিনিষটা কেনার জন্যে যখন হাতে পয়সা পাবি কিংবা যে পয়সা জমা থেকে যাবে সেটি এখানে জমাবি। আমার কথাটা মনে ধরে গেল, কিন্তু ঝামেলা বাঁধল কি কিনব। কি কিনব ও টুকুন বয়সে ঠিক করতে পারি নি। আমার কি দরকার সেটা বোঝার মতন ক্ষমতা ছিল না তাই কত টাকা জমাবো সেই পরিকল্পনা না করে ২৫ পয়সা আর ৫০ পয়সা করে জমানো শুরু করে দিলাম। এই হল, সঞ্চয় অভ্যাস হওয়ার ছোটবেলার গল্প। 

তারপর একসময় টাকা জমানোটা নেশায় পরিণত হল। প্রতি মাসে বাজেট ঠিক করতাম। আগামী মাসের কি কিনব সেটি আগের মাসে পরিকল্পনা করে ফেলতাম। আমার টাকার উৎস ছিল বাবার কাছে থেকে পাওয়া টিফিন খরচ, যাতায়াত খরচ আর নিজের কিছু কম্পিউটারের কাজ করে আয় । আমার বাজেট পরিকল্পনাটা ছিল খুব মজার ধর আমি একটা জিনিষ পছন্দ করেছি সেটির দাম ১,৫০০ টাকা তারমানে আমাকে ১,৫০০ টাকা সঞ্চয় করতে হবে। সঞ্চয় কিভাবে হবে প্রতিদিন যা আয় করি সেটি থেকে খরচ বাদ দিয়ে একটা অবশিষ্ট অংশ জমা রেখে এই ১,৫০০ টাকা সঞ্চয় করতে হবে। তারমানে প্রতিদিন হিসেবে ৫০ টাকা (১৫০০টাকা/৩০দিন) আমাকে বাঁচাতে হবে। যদি বেশী খরচ হয়ে যায় সেই ক্ষেত্রে অন্য কোন দিন হাড় কিপটামী করে হলে জমাতে হবে। একসময় আমি আমার টার্গেট পূরণ করে ফেলতাম। একসময় সেটি কিনে বাবাকে দেখাতাম বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরতেন। বাবার কাছ থেকে প্রথম জানলাম একে বলে আত্মনির্ভরশীলতা। যা খুবই সম্মানের। 

যারা মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ তাদের পক্ষে যে কোন স্বপ্ন পূরণ করা কঠিন কিছু ছিল না আবার সহজ কিছু নয়। যেমন ধরো, ডিএসএল আর ক্যামেরা বিলাসবহুল পণ্য কারোর জন্যে আবার কারো জন্যে নয়। তবে কিন্তু কঠিন কিছু নয়। একটা ডিএসএলআর কিনতে যদি ৩৬,০০০ টাকা লাগে তাহলে সেটি প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা কিংবা প্রতিদিন ১০০ টাকা জমিয়ে দুই বছরে কিনে ফেলা যায় কিংবা ৩,০০০ টাকা কিংবা ২০০ টাকা প্রতিদিন জমিয়ে একবছরে কিনে ফেলা যায়। এভাবে যে কোন জিনিষ কিনে ফেলা সম্ভব। একবছর দেখতে দেখতে চলে যায় যখন নিজের মতন করে নিজের জমানো টাকাতে কোন কিছু কিনবেন তখন বুঝতে পারবেন আপনি বিরাট কিছু অর্জন করে ফেলেছেন।