বিধ্বস্ত কখনো সখনো তবুও হারি নি

যে রাস্তা ধরে ফিরি আমি
সময়টা অন্ধ হয়ে থাকে অন্ধকারে
বিষন্নতার আকার এত বড় যে
সেখানে আরো বড় হয়ে ক্লান্তি নামে
সবকিছু সুনসান নিশ্চুপ থাকে
শুধু পায়ের নিচে পড়ে শব্দ করে ঝরা পাতা ভাঙ্গে
আমি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে কুজো হয়ে ক্লান্ত হেরে যাই
মাঝরাতে বড় বড় দানব আমাকে দুঃস্বপ্ন ভয়ে জাগিয়ে তোলে
ভয় পেয়ে যাওয়া শিশু মতন কোকাতে কোকাতে আবার ঘুমিয়ে যাই
ভোর হয় সূর্য আমাকে স্বপ্ন দেখায় নতুন করে
আমি জেগে উঠি আবার নতুন করে গা ঝাড়া দিয়ে।

২৫ আগষ্ট, ২০১৩

একাল ও সেকাল (পর্ব-১)

অ আ লেখালেখি আরেকটি প্রজেক্ট শুরু হল। আমরা সবাই একটা সময়ের সাক্ষী । আমাদের বড় হয়ে যাওয়ার পিছনে অনেকগুলো গল্প থাকে। যেগুলো আজকের বড় হতে থাকা ছেলে মেয়ের কাছে অবাস্তব ও অলৌকিক মনে হতে পারে। তবু অনেক কিছু শেখার থাকে। জানার থাকে। সেসব কথাগুলো আমাদের সবার কাছে পৌছে দেওয়াটা খুব জরুরী। নতুন প্রজম্ম যাতে ভুল পথে চলে না যায় সে দিক নজর রাখা আমাদের দায়িত্ব।

একাল ও সেকাল  (পর্ব-১)
———————
প্রথমবার স্কুল পালালাম। আমার মত ছাপোষা ও ভীরু ছেলের মতন স্কুল পালানোটা রীতিমতন ভয়ঙ্কর কিছু। বাবা রোজ অফিস যাওয়ার পথে আমাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যান। আজ ক্লাসে ঢুকে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলাম। শরীর যে খারাপ ছিল তাও না। আমার একটা নতুন বন্ধু হয়েছে ওর নাম নয়ন। আমাদের দু’জনের নামের সাথে মিল থাকায় সাতদিনের মাথায় গাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। নয়নের কথা মতন স্কুল থেকে প্রথমবার পালালাম। নয়ন থাকত স্কুলের কাছের কলোনীতে। তাই পালিয়ে গিয়ে ওর বাসায় গেলাম। ওদের বাসাটা কেমন যেন অগোছানো। বেশীক্ষন থাকি নি। বেরিয়ে বাড়ী চলে আসলাম। মা আমাকে দেখে বকা দিলেন। পরে আদর করলেন, ছেলের বোধহয় শরীর ভালো না।

পরের দিন আমাকে ক্লাস শিক্ষক ডেকে বললেন, কাল স্খুলে আসো নি কেন? আমি দুরুদুরু কম্পনে বললাম, ”শরীর খারাপ করেছিল”। স্যার বললেন, কাল বাবার কাছ থেকে সাইন নিয়ে অনুপস্থিতির দরখাস্ত নিয়ে আসবে। জীবনের প্রথম মিথ্যা কথা বলা শুরু। নয়ন আমার পিছনে বসে মুচকি হাসছিল। আমার ভিতর অপরাধবোধ হচ্ছিল। তখন ঠিক করলাম আর পালাবো না। অতঃপর মাসখানিক পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। একগাদা হোমওয়ার্ক। সামনে রোজা চল্লিশ দিনের একটা বড় বন্ধ আছে তাই অনেক পড়ার চাপ। স্কুল খুলে পরীক্ষা। স্কুল ছুটি শেষে আজকাল মা আসতে পারে তাই রোজ আমার প্রিয় কিছু সহপাঠিদের নিয়ে রেললাইন দিয়ে হাটতে হাটতে বাড়ী ফিরি।

আজ স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। স্কুল ছুটির পর নয়ন বললো, আজ আমাদের বাড়ীতে তোর দাওয়াত। আমি অবাক হলাম, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ দাওয়াত। না করতে পারলাম না। একটু খারাপ লাগলো এই ভেবে মা রোজ আমার জন্যে খাবার বানিয়ে রাখে আমি বাড়ী ফিরে সেগুলো গোগ্রাসে গিলতে থাকি প্রতিদিন। নয়নদের বাড়ীতে ফোন ছিল না। আজ খাব না, এই কথাটা মাকে জানানো গেল না। মা আমার জন্যে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করবে। ভয় ঢুকে গেল। আমি আজ শেষবারের মতন নয়নের বাসায় গেলাম গিয়ে দেখি একদল ছেলে বসে সিগারেট খাচ্ছে। পাশে ছড়ানো ছিটানো বিরিয়ানীর প্যাকেট, কাঁচের বোতল ভর্তি কোক। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা ছেলে নেতিয়ে পড়ে আছে। পাশে সিরিঞ্জ পড়ে আছে। নয়ন আমাকে রেখে পাশের ঘরে গিযেছিল। আমি তখন বুঝতে পারলাম আমি ফেঁসে গেছি নেশাখোরদের ঘরে। ওদের বাড়ীটা এক তলা, আরো কয়জন আসবে বলে মূল দরজার ছিটকানী খোলা ছিল। আমি বাথরুমের কথা বলে পালিয়ে গেলাম। সেদিন যেভাবে স্কুল পালিয়েছিলাম। সেই পালানোর সুবাদে আজকে আমি শিক্ষিত মানুষ হতে পেরেছি। আমার মতন অনেকে আছেন যারা কখন পালাতে পারেন না, চান না তখন তাদের জীবন থেকে ছুটি নিতে হয়। তাদের পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।

আজ যারা বাবা-মা, অভিভাবক তাদেরকে আমি অনুরোধ করব, আপনার ছেলেমেয়ে কাদের সাথে মিশছে তাদের সম্পর্কে খবর রাখুন। তাদের বাড়ীতে যান। তাদেরকে অভিভাবকসহ বাড়ীতে দাওয়াত করুন। নিয়মিত স্কুল শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখুন। ছেলে মেয়েদের সাথে সব কিছু শেয়ার করুন। ওদেরকে কথায় কথায় বকতে যাবেন না। বন্ধু হয়ে যান। দেখবেন ওরা আপনাকে গর্বিত করবে দারুন কিছু করে।

অয়ন আহমেদ
২২ই আগষ্ট, ২০১৩

ayonahmed@gmail.com

মেঘরা চারিদিকে আলো ছড়ায় আর ঐশীরা অন্ধকারে ঢেকে যায়

প্রচলিত কৌতুক আছে, বাঘে ছুলে ষোল ঘা, পুলিশে ছুলে আঠারো ঘা। যার অর্থ দাঁড়ায় বাঘের থেকে পুলিশ অনেক বেশী ক্ষমতার অধিকারী । আইনের চোখে দ্রুত গতিতে কার্যকর পেশা হচ্ছে পুলিশের । পুলিশের বিরুদ্ধে কেউ অপরাধ করলে পুলিশ তখন আইনের ধার ধরে না, আদালতের নির্দেশের অপেক্ষাতে থাকে না। এরা দ্রুত ট্রাইবুনালের আদালতের থেকে দ্রুত গতিতে কাজ করে।

নিহত সাগর ও রুনি পেশাগতভাবে সাংবাদিক ছিলেন । তাদেরকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে এখনও বের করা সম্ভব হয় নি, কারা হত্যাকারী। কিংবা সম্ভাব্য হত্যাকারীর টিকিটুকু ধরা যায় নি। তারা যে হত্যা হয়েছে সেটা নিয়েও মেঘ ও মেঘের মামাকে বারবার আদলতের কাছে ধরনা দিতে হচ্ছে। মেঘের র্দুভাগ্য একটাই মেঘের বাবা মা পুলিশে চাকরী করতেন না । যদি করতেন তাহলে অপরাধীদের ধরতে একদিনের বেশী সময় লাগত না। মেঘকে দাঁড়াতে হত না প্রেস ক্লাবে নিজের বাবা মার হত্যার বিচারের দাবীতে।

গত বুধবার চামেলীবাগে নিমর্ম হত্যার শিকার হয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। বুধবার বিকালে তাদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং রাতে তাদের হত্যা করা হয়। বৃহস্পতিবার চলে গেলেও কাক পক্ষী টের পায় নি। মাহফুজুর রহমানের ভাই ঘটনাটি পুলিশকে অবহিত করেন এবং শুক্রবার পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ ও মিডিয়া ঢালাও ভাবে সংবাদ প্রচার করে এবং তৎপর কার্যক্রম দেখায়। যার ফলে অসম্ভব দ্রুততায় শুক্রবারের ভিতর প্রায় সকল আসামীদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জানা গেল, নিজের মেয়ে ঐশী তাদেরকে হত্যা করে, কারন তাকে স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করতে না দেওয়া হয় নি। আমার কাছে বোধগম্য হচ্ছে না, নিজের বাবামাকে হত্যা করার মত মানসিকতা গড়ে তোলার সুযোগ পেল কি করে। পুলিশ ও মিডিয়া ঢালাওভাবে ঐশীকে উপস্থাপন করছে খারাপ মেয়ে, বাজে মেয়ে, বখে যাওয়া মেয়ে এই বিশেষণ যোগ করে। যেহেতু ঐশী মেয়ে এবং পুলিশ হত্যাকারী তাই তাকে প্রতিটি নিউজপেপারের কভার স্টোরী বানানো হচ্ছে। এখন প্রশ্ন কেন এরকম হবে, কেন হত্যা হবে, কেন একটা মেয়ে নষ্ট হয়ে যাবে? এখানে দায় কার বাবা মার নাকি সমাজ ব্যবস্থার। আজকের হতভম্ব ঐশী জানে না, বুঝবে না সামনের ভবিষ্যতের রাস্তাগুলো গভীর অন্ধকারে ঢেকে গেছে। সে খুনীকে সহায়তা করেছে তাই সে খুনী তার বিচার হতেই হবে।

অতৎপর ভবিষ্যতে আর কেউ যে এভাবে হত্যা হবে না এই গ্যারান্টি কি সমাজ, পুলিশ, আদালত, মিডিয়া কেউ কি আমাদের দিতে পারবে? যদি না দিতে পারে তাহলে দায় কার? আদালত, পুলিশ, মিডিয়া কেউ কি বখে যাওয়া এইসব ছেলে মেয়েদের কথা আদৌ কিছু ভাবছে? এদের বাবা ও মার দায় বদ্ধতা সমাজের কাছে কতটুকু? এই রকম অনেক প্রশ্ন আসবে কিন্তু উত্তর আসবে না।

শিক্ষিত সভ্য জাতি একটি দেশের মেরুদন্ড

আজকালকার যুগে প্রতিটি গুরুজনদের কাছে একটা ব্রত হচ্ছে, নিজের সন্তানদেরকে শিক্ষাদীক্ষায় মানুষ করা। সত্যিকার অর্থে মানুষ বলে গণ্য করা হবে তখনই যখন সেই সন্তান শিক্ষাদীক্ষা শেষ করে চাকরী বাকরি করে পরিবারের উপাজর্নক্ষম ব্যাক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে । তাই গুরুজনদের দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজ সন্তানের নিজের পায়ে দাঁড়ানোকে মানুষ হয়েছে বলে মনে করা হয়।

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমরা বেড়ে উঠেছিলাম একটা যৌথ পরিবারের ছায়াতলে থেকে আমাদেরকে বলা হয়েছিল, আলোকিত মানুষ হতে। প্রথমে আমাদের পারিবারিক মহলে বড় চাচা, মা, ফুপুর কাছে শিক্ষাগ্রহন পর্ব শুরু হয়েছিল তারপর ছোটবেলাতেই কোরআন শিক্ষা ধর্মকে জানার তাগিদে। জুনিয়র স্কুল পর্ব চলার সাথে কোরআনের অক্ষরগুলোও চির চেনা হয়ে উঠে। দাদা মারা যাবার সময় তাঁর প্রিয় নোকতাবিহীন কোরআন শরীফ মা’র কাছে হেফাজত করে যান। সেখানে বাংলা অর্থ সম্বলিত কোরআন শরীফ। আমি ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখেছিলাম দাদুর মতন নোকতাবিহীন কোরআন সূর করে পড়ব। এক সময় আয়ত্বে চলে আসে আমার এই আয়ত্বে আনার পেছনে বড় অবদান ছিল আমার ছোট বেলাকার আমপাড়ার হাতেখড়ি তরুন হুজুর হাবিবুর রহমান সাহেবের। উনি আমাকে পরিপূর্ণ ইসলামের আলোতে বড় করেছিলেন। উনি আমাকে কোনদিন কার্টুন দেখতে বারণ করেন নি। উনি কোনদিন বলেন নি, ছবি কিংবা সিনেমা দেখা হারাম। উনি আমাকে একটা কথা আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারোর কাছে মাথা নত করবে না কিংবা অন্য কাউকে তোমার প্রভু মানবে না।

অতঃপর আমাদেরকে শেখানো হয়েছিল বড়দেরকে সম্মান করতে এবং ছোটদেরকে সম্মান করতে। ধর্ম, গোত্র, পদ, স্থান যাই হোক না কেন, এই নিয়ম বাধ্যতামূলক ছিল। তাই আমাদের বাড়ী এসে করিম চাচা কলা দিতে এসে চা খেয়ে যেতেন। পাড়ার দোকানদার খুরশীদ ভাই মা’র ফরমায়েশ মোতাবেক জিনিষ দিয়ে যেতেন। মা উনাকে নাস্তার ব্যবস্থা করে দিতেন। আমাদের বাড়ীর কেয়ারটেকার ইদরীস চাচাকে আমরা ঈদের দিন পা ধরে সালাম করতাম। ইদরীস চাচা আমাদেরকে ভাতিজার মতন আদর করতেন। আমরা তাই রিকসাওয়লাকে ভাই যাবেন বলে ডাকি, আপনি বলে সম্বোধন করি। বাড়ীতে আজও বুয়াকে খালা বলে ডাকি। এগুলো আমাদের পারিবারিক মৌলিক শিক্ষা। ব্যবহারে বংশের পরিচয় এই আমাদের দ্বিতীয় শিক্ষা।

আমরা যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা অর্জন করি, ভালো চাকরি বাকরি করি। আমরা কিন্তু তখনো পরিপূর্ণ সভ্য মানুষ হয়ে উঠবো না যতক্ষন না আমরা আচরন, ব্যবহার, কথা বার্তাতে সুশৃঙ্খল হতে পারব। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন করে তোলে কিন্তু আলোকিত মানুষ হতে হলে শিক্ষার পাশাপাশি হৃদয়কে পরিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন করে তোলাটা বেশী জরুরী।

শুধু অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষাই শুধু মৌলিক নয়, ভালো মনের মানুষ হওয়াও অন্যতম মৌলিক শিক্ষা যা আমাদের সমাজকে সব সময় আলোকিত করে রাখবে।

নিজস্বতা গড়ে তোলার ইচ্ছা

ধানমন্ডি দীদা আমার বাবার বড় চাচী বেগম সুফিয়া কামাল আমার ভিতর প্রথম বীজ বপন করেছিলেন কবিতা লেখালেখির। মা আমাকে প্রথম বই পড়ার অভ্যাসটা গড়ে দিয়েছিলেন। বাবা ছোটবেলা থেকে আমাকে বিভিন্ন ম্যাগাজিন পড়ে শুনিয়েছিলেন। সবাই মিলে আমার ভিতর গড়ে দিয়েছিল সৃজনশীল কিছু করার অভ্যাসটাকে। বড়চাচা তাই প্রায়ই বলতেন কখনো নকল কোন রূপ নিয়ে বেড়ে উঠো না নিজের ভিতর আসল রূপটাকে নিজের মতন করে গড়ে তুলো। আমি অনেক দিন ধরে কথাটার মর্মার্থ বুঝতে পারি নি। আজকাল প্রতি নিয়ত বুঝতে পারি । নিজস্বতা কাকে বলে, মুখোশধারী কাদের বলে।

মুশতাক স্যার আমার ইউনিভাসিটির প্রিয় স্যার, উনার ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ক্লাসে আমাকে একটা কথা বলেছিলেন। নিজের নামটাকে সম্মানিত করো। আমি উনাকে আমার লেখা একটা কবিতার বই উপহার দিয়েছিলাম। তখন উনি আমার সহপাঠীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, এইযে দেখো, আমার প্রিয় ছাত্র অয়ন আহমেদ আমাকে ওর নিজের লেখা কবিতার বই দিয়েছে। ও এখন একটি ব্র্যান্ড হয়ে গেছে। এই ব্র্যান্ড নাম হচ্ছে অয়ন আহমেদ। ও নিজেকে কত ‍সুন্দর করে ব্র্যান্ডিং করেছে। আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম।

আমি এখনও লিখে যাই নিজের জন্যে, ছবি তুলি নিজের মতন করে। আমি কবি আমিই পাঠক, আমি আলোকচিত্রী আমিই দর্শক। নতুন বই বের হয় অনেকগুলো বছর পেরিয়ে। ছবি স্থান পায় প্রদশর্নীর গ্যালারীগুলোতে। এগুলো আমাকে টানে না। প্রচার বিমুখতার জন্যে আমার সৃষ্টি নিয়ে বানিজ্যতে আমার অস্বস্তিবোধ হয়। আমি সৃষ্টিকে ভালবাসি, ওরা আমার সন্তানের মতন, নিজের সন্তানকে কি ব্যবসায়ের পূজি করা যায়? প্রিয় দীদা আমাকে একটা কথা বলতেন,“ নিজেকে কোনদিন বিকিয়ে দিও না । কখনো টাকার পিছনে ছুটো না, এমন কিছু করে দেখাও যাতে আমাদের সবার গর্ব হয়, তখন দেখবি টাকা তোর পিছনে ছুটছে। তুই কোনদিন অহংকারী হবি না। জীবনে যদি বড় হতে চাস তাহলে অহংকারকে কবর দিস “।

একজন ছবির গল্পকার

“তুইতো দারুন ছবি তুলেছিস” – রবিনের উচ্ছ্বাস, রবিন আমার স্কুলের বন্ধু। ও সবসময় আমাকে নিয়ে সবকিছুতেই উৎসাহ দেয় । ”আমাদের গ্রামের সব বিয়েতে ভালো ছবি তুললি । ঢাকাতে পড়াশুনার জন্যে যাচ্ছিস, লেখাপড়ার খরচ জোগাতে ফটোগ্রাফিতো শুরু করতে পারিস। এতে তোর পড়াশুনার খরচতো উঠে আসবে“ – রবিনের এই কথাটা আমার দারুন মনে ধরলো। বাবাকে বলতে সাহস পেলাম না। বাবা সবে আমাদের ধানের জমি বিক্রি করে আমার পড়াশুনার ভর্তির খরচটা দিচ্ছেন। ছেলে ঢাকায় পড়াশুনার সুয়োগ পেয়েছে তাই বাবা দাদুর শখের জমিটাও বিক্রি করে দিয়েছেন। অতঃপর নিরুপায় হয়ে মাকে জানালাম নিজের শখের কথা মা চুপচাপ শুনলেন কিছু বললেন না। আমি নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে প্রিয় গ্রাম ফেলে ঢাকায় যাচ্ছি নতুন জীবন গড়তে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদল আমার প্রিয় বন্ধু রবিন, বাবা-মা, ছোট বোনটা। আমি নৌকাতে উঠে ওদের দিকে তাকালাম না। কষ্ট হচ্ছিল খুব। রবিন দূর থেকে চিৎকার করে বলছিল, ”বন্ধু ভালো থাকিস। ঢাকায় পৌছে ফোন দিস”।

নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে মাস খানিক লেগে গেল। নতুন জীবন গোছাতে অল্প সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছিল। আমার মা ফোনে প্রায় ফোপায় তাই আমি পারতপক্ষে মাকে ফোন করি না। বাবার সাথে শুধু টুকটাক আলাপ হয়। হঠাৎ একদিন দেখি আমার ছোট মামা জাপান থেকে ফিরে আমার ইউনিভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। আমি খুশীতে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। মামাকে আমাদের ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখালাম। ক্যান্টিনে বসে খাচ্ছিলাম তখন মামা আমাকে একটা ব্যাগ ধরে দিয়ে বললো, বাবা তোকে তোর মা এটা দিতে বলেছে। আমি খুলে দেখি ডিএসএলআর ক্যামেরা। আমি হতবাক হয়ে গেলাম। মামাকে বললাম, ”তুমি এত দামী ক্যামেরা কেন কিনেছ “? মামা বললো, আমি কিনি নি তোর মা তার বিয়ের বালা বিক্রি করে আমাকে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি দেশে ফেরার সময় তোর জন্যে নিয়ে আসলাম। তোর জন্যে আমি ক্যাসিও ঘড়ি এনেছি। তোর মনে আছে তুই ছোটবেলাতে আমার কোলে বসে আমার ঘড়ি ধরে খেলতি। আমি বাকহারা হয়ে বসে আছি।

মহাখালী মেস বাড়িতে ক্যামেরা জড়িয়ে ঘুমুতে যাই। মাকে ফোন দিয়েছিলাম। মা এবার হেসে কথা বলেছে। এই প্রথম মা’র কন্ঠে খুঁজে পেলাম বিশ্বজয়ের উচ্ছ্বাস। ছেলের শখের জন্যে মা কতটা উদগ্রীব ছিল আমি উপলব্ধি করেছিলাম। ঢাকা শহরের আনাচে কানাচের জীবন নিয়ে আমি ছবি তুলতে শুরু করলাম।

আমি মার্কেটিংএ মেজর নিয়েছি তাই এ্যাডভারটাইজমেন্ট কোর্স এ এ্যাসইমেন্ট এ নিজের ছবি যুক্ত করে ক্রিয়েটিভ করার চেষ্টা করছি। একটা প্রেজেন্টেশন ছিল সেখানে ছোট করে ভিডিও এড এর কাজ করলাম। সবাই প্রশংসা করলো। আমি এ প্লাস পেলাম। মুশতাক স্যার আমাকে উনার টিচিং এসিস্টেন্ট বানিয়ে দিলেন। আমি অনেক ‍প্রনোদনা নিয়ে কাজ শুরু করলাম।

হঠাৎ একদিন আমার স্যার বললেন, ”আমার ভাইয়ের ছেলের বিয়ের ছবি তুলবে নাকি”। আমি ঘোরের ভিতর থেকে হ্যাঁ বলে দিলাম। আমি এখন সেনাকুঞ্জে ছবি তুলছি। স্যার আমাকে ডাকছে ঐ এদিক আয় আমাদের ছবি তোল। স্যার আমাকে আপন ছেলের মতন আগলে রাখলেন। দুই একজন আমাকে ক্যামেরাম্যান ডাকাতে স্যার তাদেরকে বকে দিলেন তোমরা ফটোগ্রাফারকে সম্মান দিতে জানো না। আমি দেখতে পেলাম কনে পক্ষে অনেক ভালো ফটোগ্রাফার এসেছেন। তারা অনেক সুন্দর ছবি তুললেন। আমি উচ্ছ্বাসিত হয়ে তাদের কাছে গেলাম। আমি আমার ছবি সম্পর্কে তাদের মতামত জানার চেষ্টা করলাম তারা আমাকে পাত্তা দিলেন না। আমি একটু দূরে যেতে দেখি তারা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। আমি কিছুটা আশাহত হলাম। আমি ফটোগ্রাফারকে খুব আপন ভেবে কাছে টেনে নেই। তাই তাদের জন্যে কয়দিন মনোকষ্টে ভুগলাম। একসময় ভাবলাম ফটোগ্রাফি ছেড়ে দেই।

আমি গ্রাজুয়েশন শেষে আমি ছোট একটা এ্যাড এজেন্সিতে চাকরী পেয়ে গেলাম। আমি এখানে ওখানে ছবি তোলার বিষয়গুলো শিখতে শুরু করলাম। আমি টানা দুই বছর কাজ শেষে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলাম। আমি বসের অনুরোধে পুরো ক্রিয়েটিভ টিমের দায়িত্ব নিলাম। আমরা সবাই ফটোগ্রাফাররা মিলে বন্ধুর মতন পরিবেশ সৃষ্টি করে কাজ শুরু করলাম। আমি জুনিয়র ফটোগ্রাফাদের নিয়ে ছোট ছোট টিম করে দিলাম। ওরা সবাই এককভাবে দক্ষ হয়ে উঠল। ওদের কাজ দেখে আমিও মুগ্ধ হলাম। ওরা আমাকে খুব সম্মান দেয় আমি ওদের স্নেহ করি। আমাদের কাজ সবগুলো ম্যাগাজিনে যাচ্ছে। আমার বস আমাকে নিয়ে খুব গর্বিত।

আজকে আমি বড় একটা মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, আমি সিনিয়র ফটোগ্রাফার ও ক্রিয়েটিভ ডির্পাটমেন্টের হেড।

আমি মাকে গেল বছর ঈদে টিভি কিনে দিয়েছিলাম। মা’র অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল নিজের ঘরে বসে টিভি দেখবে। অনেকদিন রবিনদের বাসায় টিভি দেখেছে। বাবাকে পাঞ্জাবী, ছোট বোনটাকে একটা সুন্দর ফ্রক আর পুতুল দিয়েছিলাম । আমার বোন সেই পুতুল নিয়ে রোজ ঘুমুতে যায়। আমার সেই জাপান ফেরত মামাকে একটা দামী টাইটান ঘড়ি কিনে দিলাম। মামাকে আমাকে জড়িয়ে অনেকক্ষন কাঁদলেন। কারন আমি মামার ভালবাসা প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কখনো ভুলে যাই নি। আর আমার প্রিয় বন্ধু যে আমাকে প্রথম ফোন দিয়েছিল আমি ঢাকায় ঠিক মতন পৌছেছি কিনা রবিনের জন্যে নোকিয়া মোবাইল ফোন। ও খুব নোকিয়া ভক্ত ।

কয়দিন পর ঈদ। আমি আবার দেশের বাড়ী যাচ্ছি। এইবার মার জন্যে একটা ফ্রিজ কিনে নিয়ে যাচ্ছি। মা’র অনেকদিনের শখ ঠান্ডা পানি খাবে।