হুমায়ূন আহমেদ ও তাঁর সহজাত দর্শন চিন্তা : (০২)

এই দেশের মানুষের সাইকোলজি হচ্ছে ক্ষমতায় যে আছে তার বিপক্ষে কথা বলা। যতদিন পর্যন্ত তুমি ক্ষমতায় নেই ততদিন পর্যন্ত তুমি ভাল। যে মুহূর্তে ক্ষমতায় চলে গেলে সেই মুহূর্ত থেকে তুমি খারাপ। তোমার বিরুদ্ধে জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন। বড় বড় বক্তৃতা।

___ ” কোথাও কেউ নেই “

ক্রিটিক কিন্তু ক্রিটিজম নয়

প্রথমে দাদুকে দেখতাম রোজ বিকালে একদল মহল্লার লোকজনদের নিয়ে কিসব আলোচনা করতেন, আমি দাদুর কোলে বসে দাদা দাঁড়ি ধরে টানতাম। দাদা মোটেও বিরক্ত হতেন না। আমি খুব ছোট ছিলাম বলে আলোচনার বিষয়বস্তু বুঝতে পারতাম না। সবার গুরু গম্ভীর ভাব দেখে আমিও গম্ভীর ভাব দেখাতাম। পরে বাবার কাছে শুনেছি দাদু সবার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন, সমাজের গঠনমূলক কার্যক্রমের কথা নিয়ে আলাপ করতেন। দাদু সমাজসেবী ছিলেন।

গঠনমূলক কার্যক্রম ধারনা সর্বোপ্রথম আমার বাবা আমার মাথায় ঢুকিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন কিভাবে শিখতে হয় এবং কিভাবে শিখাতে হয়। আমাকে যাই শিখিয়েছেন তাই আমি রপ্ত করে আমার ছোট ভাই বোনগুলোকে শিখিয়েছি। এখন এই শেখানোর কাজটা অনেকে করেন না। কারন যদি শিখে যাওয়া নতুন মানুষটা যদি তার বাড়া ভাতটা খেয়ে ফেলে। এ খুবই হাস্যকর, প্রতিহিংসামূলক এবং স্বার্থপর চিন্তা। তাই এখন আমরা আমাদের সবাই গঠনমূলক চিন্তা ভাবনা থেকে অনেক দূরে চলে গেছি। তাই আজকাল সবাই ক্রিটিজম বলে ক্রিটিক না বলে। আমাকে কেউ কারো সম্পর্কে কোন ভুল সেস্টমেন্ট দিল আমি সেটির লিখিত প্রতিবাদ করলাম তাকে বলে ক্রিটিজম । যখন কবিতা লেখি, গল্প লেখি, ছবি তুলি, গান গাই, তখন কবিতার কোথাও ভুল ঠিক করে দেওয়া, গল্পের কোন লাইন সংশোধন করে দেওয়া, ছবির কোথাও ভুল রয়ে গেছে সেটি সংশোধন করে দেওয়া, গানের স্বরলিপি অনুযায়ী সুর হচ্ছে না সেটিকে ঠিক করে দেওয়াকে বলে ক্রিটিক। ক্রিটিক কিন্তু শিল্প শৈলির গঠনমূলক আলোচনা। অথচ মজার বিষয় এই ক্রিটিককে সবাই ক্রিটিজম বলে গোড়াতে ভুল করে বসে আছে।

আমরা সবাই ফটোগ্রাফার

আমি প্রায়ই একে ওকে বলতে শুনি ভাই আপনি তমুক গ্রুপের ফটোগ্রাফার নন। গ্রুপ ভিত্তিক ফটোগ্রাফার পরিচয় আমার কখনোই ভালো লাগত না। আজও লাগে না। আমার কথা একটাই একজন ফটোগ্রাফারের পরিচয় একটাই “ফটোগ্রাফার” । ফটোগ্রাফি শিল্প তাই ফটোগ্রাফার তার নান্দনিক শিল্পমন দিয়ে ক্যামেরা দিয়ে ছবি এঁকে যায়। প্রতিটি গ্রুপে ফটোগ্রাফাররা জানতে চায় আরেকজন ফটোগ্রাফারের মতামত। দয়া করে কাউকে বলবেন না, উনি ওমুক গ্রুপের ফটোগ্রাফার, উনার সাথে মেশা যাবে না। এজন্য আমাদের পরিচিত-অপরিচিত ফটোগ্রাফার ভাবেন গ্রুপ মানেই ক্যাচাল, ঝগড়া ঝাটি। মনে রাখবেন, গ্রাসহপার্স হচ্ছে, ফটোগ্রাফারর্স পরিবার। এখানে আমরা সবাই এক। সবাই আনন্দ, খুশী মনে একসাথে থেকে ফটোগ্রাফি শিখবে এবং শিখাবে। এখানে সবার একটাই পরিচয় আমরা সবাই ফটোগ্রাফার এবং একই পরিবারের সদস্য । হ্যাপি ক্লিকিং।

বিচারের আশায় আমাদের প্রান চলে যায়

কিছুক্ষন আগে বাড়ী থেকে লাঞ্চ করে ফিরলাম। বাড়ী যাওয়ার পথে দেখি পল্টন মোড় থেকে বিজয় নগর পুরোটা রাস্তায় দাঙ্গা পুলিশে সয়লাব। আমজনতা কোনায় কোনায় ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। সাড়িসাড়ি অনেকগুলো খাবারের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তাতে গাড়ীর ভাঙ্গা কাঁচের টুকরা । দু’টো গাড়ীর চারপাশে একদলা মানুষের ভিড় আমি উঁকি দিয়ে দেখি সবাই গাড়ীর ভাঙ্গা কাঁচ দেখছে আর মালিকের বিলাপ উপভোগ করছেন। একটা ফটোগ্রাফারকে দেখলাম রাস্তায় বসে গাড়ীর ভাঙ্গা কাঁচের ভিতর সাবজেক্ট চেষ্টা করছেন। খুব খারাপ লাগলো গাড়ীর মালিকটির জন্যে এতগুলো মানুষ তার দুঃখ উপভোগ করতে ভীড় করছে অথচ তার ক্ষতি থেকে কেউ তাকে রক্ষা করতে পারে নি। ভাঙ্গাভাঙ্গি শেষে পুলিশ আসবে বলবে মামলা করতে। মামলাকে টাকা খরচা হবে। গাড়ীতে টাকা খরচা হবে। এই সব খরচা হবে ক্ষতিগ্রস্থের। 

আগামী সকাল সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে জামায়াত ইসলামী। হরতালের কারন তাদের নেতাদেরকে জেল জরিমানা দেওয়া হয়েছে। হরতালের আগের দিন তাই ভাঙ্গচুর করে একটু জানান দেওয়া যে আগামীকাল হরতাল হবে। আমাদের সরকার খুব ভালো করে জানেন কারা এই সব নাশকতা করছেন। কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নিতে অপারগ কারন তারা কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, সব কিছুতে প্রমানের অভাব, স্বাক্ষীর অভাব। আর অন্যদিকে বিচারের আশায় আমাদের প্রান চলে যায়।

ফ্লাটবাড়ী

বাড়ী খুঁজি হৃদয়ে গোপনে, যেখানে সম্মুখে একটু সবুজ উঠোন, পাশে মা’র ফুল বাগান, বাড়ী পিছনটাতে একটা ছোট পুকুর যেখানে আমার ছেলেবেলা, আমার পড়া টেবিল বরাবর জানালা যেখানে ঝুলতে ঝুলতে আমাকে ডাকে আমার খেলার সাথীরা। সন্ধ্যা হলে ঝিঁঝিঁ ডাকে পড়তে বসা। ডুবে যাই বইয়ে। ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। তখন পূর্ণিমাকে খুব আপন মনে হয়, আলো দিয়ে আদর দিয়ে যায়। 

আজ আমরা যে বাড়ীতে থাকি সেটি একটি আবদ্ধ ফ্লাট । আমার মা শখ করে এই ফ্লাটটা কিনেছিলেন। নানা ভাই মা’র নামে নানাভাইয়ের জমির একটা অংশ উইল করে গিয়েছিলেন। নানাভাইয়ের মৃত্যুর পর মা সেখানে থাকতে রাজী হন নি । মা সেখানে থাকবেন না বলে সেই জমির অংশ বিক্রি এই ফ্লাট বাড়ী। আমাদের ফ্লাট বাড়ী কেনার মতন সাহসিকতা আমাদের ছিল না। মা‘র একান্ত ইচ্ছাতে আমরা ফ্লাট কিনলাম। ফ্লাট কেনার পিছনে মা’র কিছু জমানো টাকা আর আমাদের ঘানি টানা কিছু লোন দিয়ে আমাদের মায়ের স্বপ্নের ফ্লাট।

আমাদের ফ্লাট কেনার টাকা এল অনেক কষ্ট করে। অথচ এখন কালো টাকার দৌরাত্মে অনেকে ঢুমসে ফ্লাট কিনছে, জমি কিনছে। আমরা এত পড়াশুনা করে, ভালো রেজাল্ট করে, ভালো চাকরি করেও একটা ফ্লাট কিনার মতন দুঃসাহস দেখাতে পারি না। একদিন হয়ত আরো মন খারাপ করা কথা শুনব , কি ভাই ফ্লাটটা কিনতে কত টাকা মেরেছেন? । এরকম কথা বলার সুযোগা সরকার করে দিয়েছে কালো টাকার মালিকদের ফ্লাট ও জমি কেনার জন্যে আকুতি করে। আর যারা কষ্ট করে জমি বেঁচে, লোনের বোঝা মাথা নিয়ে ফ্লাট কিনবে তাদের গায়ে লেপ্টে থাকবে সন্দেহের কালো টাকা গন্ধ। আমি সেই মিথ্যা অপবাদের কথা ভেবে শংকিত।

সেই মোচড়ানো ব্যথা

একবার মা বকেছিল মন খারাপ করেছিলাম অনেক। দোষ কিন্তু তেমন ছিল না। শুধু আমার বাড়ী ফেরার রাস্তা একদিন বড় হয়ে গিয়েছিল। সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে কাক ভেজা হয়ে বাড়ী ফিরেছিলাম রিকসা পাই নি বলে। মা বকেছিল ঠান্ডা লাগবে বলে অথচ সেদিন বুঝতে পারি নি। খুব রাগ করে বাড়ী ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম রাতভর রাস্তাতে হেঁটে বেড়িয়েছিলাম ঢাকার এ প্রান্ত ও প্রান্ত। আমার পাগলামাতো আজও হাসি পায়। সেই পাগলপন মন এখন নেই তবে সেই হুটহাট মন খারাপ করার অভ্যাস কিন্তু আমাকে আজও ছেড়ে যায় নি। 

তাই আজও কোন দোষ না করে যখন কেউ আমাকে দোষারোপ করে তখন হাসি মুখে মেনে নেই কিন্তু বুকের ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠে। আর সেই মোচড়ানো ব্যথাকে সামলে উঠতে সময় লেগে যায়।

আমরা ভুলে গেছি

আমাদের যাদের এ্যাকুরিয়ামে মাছ পোষার শখ আছে তাদের কাছে গোল্ড ফিস খুব পরিচিত নাম। গোল্ড ফিসের খুব একটা মজার বিষয় আছে। সেটি হচ্ছে ৩ থেকে ৫ সেকেন্ডের ভিতর গোল্ড ফিসের মেমোরী লস হয়। যার মানে সে ৩-৬ সেকেন্ডের ভিতরে পুরানো স্মৃতি ভুলে যায়। 

এই গোল্ড ফিসকে টেনে আনার বিষয় হচ্ছে আমাদের অতি দ্রুত ভুলে যাওয়ার স্বভাব। আমরা ভুলে গেছি সাভার ট্রাজেডি, হলমার্ক কেলেঙ্কারী, তাজরীনে আগুন, গনজাগরন মঞ্চ, হেফাজতে ইসলাম। আমরা দেশপ্রেমিক তাই আমাদের ভালবাসাটা বোধহয় রাজাকারের ফাঁসির ভিতর সীমাবদ্ধ। এখন সব ভুলে গিয়ে আমরা বাজেট নিয়ে লাফাচ্ছি। কিন্তু কেউ কি খেয়াল করেছি ঘাটতি বাজেট বলে একটা শব্দ উচ্চারন করা হচ্ছে যার মানে হচ্ছে ধারের বাজেট। বাংলাদেশের উন্নতির একটা বড় অন্তরায় ঘাটতি বাজেট এর পরিমান যত দিন বাড়বে ততদিন লোনের বোঝা আমাদের মতন সাধারন আমজনতার টানতে হবে। রাজস্ব ব্যয় ২,১৫,০০০ কোটি টাকা যার ভিতর আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১,৭০,০০০ কোটি টাকা। যার একটা প্রধান অংশ আসবে আমাদের করের টাকা থেকে। আমাদের আয় ব্যয়ের হিসাব কাটাকুটি করে দেখা গেছে ৩০ শতাংশ আয় হ্রাস পেয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। এখন নতুন করে ঘাটতি বাড়ানোর জন্যে আমরা যেখানে ১৫,০০০ টাকা আয় করে ব্যয় মিটিয়ে কোন মতে ৫,০০০ টাকা সঞ্চয় করতে পারবো সেই টাকাও এখন কমে গিয়ে হয়ত ২,০০০ টাকা জমবে। সরকার কিন্তু এখনও নিশ্চয়তায় দেয় নি যে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবন ধারনের ব্যয় কমে যাবে যার ফলে আমাদের আয় বাড়বে। এই হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। কিন্তু দেশের লোনের বোঝা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর বুদ্ধি সত্যি খুবই হাস্যকর কেননা, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারী, হলমার্ক কেলেঙ্কারীর অর্থ এখনও ব্যাক্তি মালিকানাধীন হয়ে আছে যেই অর্থ সরকার এখন উদ্ধার করতে পারি নি নাকি চেষ্টা করেনি সে উত্তর আমরা কোন দিন জানতে পারব না।